১৯৮২ সালে বোস্টন কম্পিউটার এক্সচেঞ্জ (BCE) নামে একটি কোম্পানি সর্বপ্রথম অনলাইন ই-কমার্স ব্যবসা চালু করে। এই কোম্পানিতে মূলত পুরনো কম্পিউটার কেনাবেচা করা হতো। যদি তখনকার ই-কমার্স স্ট্র্যাটেজির সাথে এখনকার স্ট্র্যাটেজির তুলনা করা হয়, তাহলে সেখানে আপনি আকাশ-পাতাল তফাত দেখতে পাবেন। তখন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ছিল একদম সাধারণ। এমনকি, সেখানে অনলাইন পেমেন্টও করা যেত না। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এবং, প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে।
অর্থাৎ, ই-কমার্স কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আসে। বর্তমানে যত টপ ই-কমার্স ব্যবসা আছে, তারা সবাই নতুন ট্রেন্ড অনুসরণ করেই তাদের ব্যবসা বড় করেছে।
আজকের এই ব্লগে আমরা এই ট্রেন্ডগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা করব, যেগুলো অনুসরণ করা ই-কমার্স ব্যবসার জন্য ফরজ। তো চলুন, শুরু করা যাক।
ট্রেন্ড বিভিন্ন ধরণের হতে পারে, যেমন: কালচারাল ট্রেন্ড, টেকনোলজিকাল ট্রেন্ড, মার্কেটিং ট্রেন্ড, ইত্যাদি।
কালচারাল ট্রেন্ড হলো আপনার দেশে, কিংবা শহরে বর্তমানে কোন বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি, বা কথা বলছে সেটি ফলো করা। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে বর্তমান কালচারাল ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সাস্টেনিবিলিটি এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য: বর্তমানে গ্রাহকরা আস্তে আস্তে আরো পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকছে এবং তারা ঐসব ব্র্যান্ড পছন্দ করেন যারা পরিবেশবান্ধব পণ্য সরবরাহ করে থাকে।
ব্যক্তিগতকরণ: ক্রেতারা আরও ব্যক্তিগতকরণ এক্সপেরিয়েন্স চায় যেটা তাদের ইউনিক পছন্দ ও প্রয়োজনকে পূরণ করে, এই ট্রেন্ডটি আপনি ওয়েবসাইট এবং পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন। যেমন: একজন ব্যবহারকারীকে আপনি ঐসকল পণ্য বেশি দেখাবেন যেটি সে বেশি সার্চ করেছেন। পণ্যের ক্ষেত্রে যেকোনো পার্সোনালাইজড বা কাস্টমাইজড বোঝায়।
সোশ্যাল কমার্স: সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে গ্রাহকদের কেনাকাটার ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া যেমন টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকে শপিংয়ের জন্য অনেক ফিচার আছে যেগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকরা খুব সহজেই কেনাকাটা করতে পারেন। এর ফলে আমরা দেখি ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মতো একটি নতুন মার্কেটিং পন্থা ব্যবসাগুলো বাস্তবায়ন করছে এবং সেটির ইতিবাচক ফলাফলও পাচ্ছে।
এছাড়াও কালচারাল ট্রেন্ডের সাথে বিভিন্ন ভাইরাল বিষয় জড়িত। যেমন: স্বপ্ন সুপারশপে ১৬০ টাকার গরুর মাংসের প্যাকেজটি বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলে। সেটি দেখে অন্য সুপারশপগুলো একই রকম পণ্য বাজারে নিয়ে আসে এবং সেটি বেশ ভালোই সাড়া ফেলে গ্রাহকদের কাছে।
নতুন সব প্রযুক্তির ব্যবহারকে ই-কমার্স ব্যবসায় টেকনোলজিক্যাল ট্রেন্ড বলা হয়। এর মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), এআর, ওয়েব ৩.০ ইত্যাদি অন্যতম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): এআই (AI) এমন একটি প্রযুক্তি যা মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটি ডেটা অ্যানালিটিক্স, অটোমেশন এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
AI মার্কেটিং কৌশলে গ্রাহকের পছন্দ-অপছন্দ, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, এবং পূর্বের ক্রয় আচরণ বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগতকৃত প্রস্তাবনা দেয়।
যেমন: Netflix এবং Amazon তাদের গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত কনটেন্ট ও পণ্য সুপারিশ করতে AI ব্যবহার করে।
অগমেন্টেড রিয়ালিটি (এআর): এআর (AR) এমন একটি প্রযুক্তি যা বাস্তব এবং ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। এটি গ্রাহকদের পণ্য বা সেবার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়। যেমন: ভার্চুয়াল ট্রাই-অন (Virtual Try-On): গ্রাহকরা পণ্য কেনার আগে সেটি কেমন লাগবে তা পরীক্ষা করতে পারে।
চ্যাটবট এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট: বিভিন্ন ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন আপনি কয়েক সেকেন্ড সাইটে ঘোরাঘুরি করলে অটোমেটিকভাবে চ্যাট অপশন ওপেন হয়ে যায়। এটি মূলত কাস্টমারের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর অটোমেটিক চ্যাটের মাধ্যমে প্রদান করে থাকে। চ্যাটবটের মাধ্যমে মিটিং বুক করা থেকে শুরু করে পণ্যের বিবরণ ইত্যাদির মতো আরও অনেক অ্যাডভান্সড কাজ করা সম্ভব।
ভয়েস সার্চ অপটিমাইজেশন: ভয়েস সার্চ পপুলার মাধ্যম অনলাইনে পণ্য খোঁজার ক্ষেত্রে, তাই এটি একটি কার্জকরি ট্রেন্ড ফলোকরার জন্য। তবে এটি ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য আপনার ওয়েবসাইটটি মোবাইল ফ্রেন্ডলি হতে হবে কারণ বেশিরভাগ ভয়েস সার্চ আসে মোবাইল ডিভাইস থেকে। এছাড়াও খেয়াল রাখবেন যে প্রোডাক্ট বিবরণ যেন ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজে লিখা হয় কারণ ইউজার তার ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজে সার্চ দিয়ে থাকে।
রেসপন্সিভ ওয়েবসাইট: বর্তমানে সকল ওয়েবসাইট মোবাইল রেসপন্সিভ করা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। মোবাইল রেসপন্সিভ না হলে আপনার ওয়েবসাইটে ৫০-৮০% কনভার্সন কমে যেতে পারে। মোবাইল রেসপন্সিভ শুধুমাত্র সাইট কনভার্সন রেট বাড়াতে সাহায্য করে না, এটি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং সার্চ ইঞ্জিন র্যাঙ্কিংয়েও সহায়তা করে।
নতুন নতুন প্রযুক্তি আসার মধ্য দিয়ে মার্কেটিংয়ের আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধুমাত্র টেলিভিশন, পোস্টার কিংবা ওয়ার্ড অব মাউথ স্ট্র্যাটেজির মধ্যে মার্কেটিং সীমাবদ্ধ নেই। ই-কমার্স ব্যবসাগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি রান করছে।
কেনাকাটাযোগ্য পণ্য এবং বিজ্ঞাপন: টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ছাড়াও ইউটিউবে এখন প্রোডাক্ট ট্যাগের ফিচার রয়েছে যার মাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে ব্র্যান্ড, তাদের প্রোডাক্ট সরাসরি বিক্রি করতে পারছে। এই স্ট্র্যাটেজিটি বেশ কার্যকরী কারণ এতে অনেক বড় একটি টার্গেটেড কাস্টমারের কাছে সহজেই পৌঁছানো যাচ্ছে এবং কাস্টমার খুব সহজেই ট্যাগ করা প্রোডাক্টের লিংক ভিজিট করে কেনাকাটা করতে পারছে। আপনার যদি ই-কমার্স ব্যবসা থেকে থাকে তাহলে এই ফিচারটি আপনার ব্যবসা বাড়াতে অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
লাইভ-স্ট্রিম এর মাধ্যমে বিক্রি: এই ট্রেন্ডটি হলো মূলত সোশ্যাল মিডিয়াতে লাইভ-স্ট্রিম করে প্রোডাক্ট এর প্রমোশন করা, তবে এই স্ট্র্যাটেজিটি আরো কার্যকর হবে যখন ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটিদের নিয়ে লাইভ-স্ট্রিম হোস্ট করলে। এটি একই সাথে ব্র্যান্ড ভিসিবিলিটি ও সেল বাড়াবে। যেমন: দারাজ প্রতিবছর তাদের ১১:১১ ইভেন্ট লাইভ-স্ট্রিম করে ব্যাপক পণ্য বিক্রি করে থাকে। আপনি ব্যবসা ছোট হয়ে থাকলে অভিজ্ঞ কারো মাধ্যমে রেগুলার লাইভ-স্ট্রিম হোস্ট করতে পারেন। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক নতুন ব্র্যান্ড তৈরী হয়েছে।
কাস্টমার দ্বারা কন্টেন্ট: এটি মূলত প্রোডাক্ট ব্যবহারকারী/কাস্টমারের মাধ্যমে কন্টেন্ট তৈরি করাকে বোঝায়। যেমন: ওয়েবসাইটে প্রোডাক্টের রিভিউ অপশন রেখে কাস্টমারদের কাছ থেকে রিভিউ সংগ্রহ করা এবং সেটি ভবিষ্যৎ কাস্টমারদের দেখানো। একটি পসিটিভ রিভিউ প্রোডাক্ট এর গ্রহণ যোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দেয়, তবে অবশ্যই রিভিউ পসিটিভ এবং অথেন্টিক হতে হবে, কারণ ফেক বা নেগেটিভ রিভিউ আপনার প্রোডাক্ট ও ব্র্যান্ড এর নাম নষ্ট করবে।
ইনফ্লুয়েন্সার কোলাবোরেশন: আপনার প্রোডাক্ট আরও বড় অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং অন্যতম মাধ্যম। এই মার্কেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে আপনি আপনার পণ্য তরুণ অডিয়েন্সের কাছে প্রচার করতে পারবেন কারণ ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি বড় অংশের ফলোয়ার হলো তরুণ অডিয়েন্স। এছাড়া আপনার ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং বেশ কার্যকরী স্ট্র্যাটেজি।
অনলাইন শপিং এর ট্রেন্ড গুলো অনেক দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং সামনে আরো নতুন নতুন স্ট্র্যাটেজি ও ট্রেন্ড আসবে। ই-কমার্স ব্যবসাগুলিকে এগিয়ে থাকতে হলে অবশ্যই বর্তমান ট্রেন্ড গুলোর সাথে আপডেটেড থাকতে হবে নয়তো অন্যদের থেকে পিছিয়ে পরে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আশা করি এই ব্লগটি আপনার ই-কমার্স ব্যবসায় কাজে আসবে এবং অবশ্যই ট্রেন্ডগুলো আপনার ব্যবসার গাইডলাইন অনুযায়ী ইমপ্লিমেন্ট করবেন।
আপনার ই-কমার্স ব্যবসার সেলস এবং মার্কেটিংয়ের কাজগুলোকে অটোমেটেড করতে আমাদের সাথে একটি ফ্রি কাউন্সেলিং মিটিং বুক করতে পারেন। আমরা আপনার ব্যবসার প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে কী কী করতে পারেন তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করব। মিটিং বুক করতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।